
জয়সাগর নিউজ ডেস্ক:
জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই অপরাধে মামলার অন্য আসামি সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
ছয়টি অপরাধমূলক ঘটনার দুটি অভিযোগে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল সোমবার এই রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক কোনো সরকারপ্রধানকে সাজা দেওয়ার নজির সৃষ্টি হলো। রায়ে ৭৮ বছর বয়সী ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতেও সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবার এবং শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আন্দোলনকারীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে। এর আগে সকাল ১১টায় রায় ঘোষণা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টায় তা শুরু হয়। টানা আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে রায় ঘোষণা কার্যক্রম।
নিজের গড়া ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিচার
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা। ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পরে মামলার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-২ অকার্যকর করে দেওয়া হয়। তার আগ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ১১টি মামলার রায় হয়।
আর গত ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে রায় আসে ৪৪টি। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ৫৫টি মামলার রায় আসে ট্রাইব্যুনাল থেকে। এসব রায়ের পর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত শীর্ষ পর্যায়ের ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ছয় আসামির মধ্যে পাঁচজনই জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী।
এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। গত বছর গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনেও সংশোধন আনে সরকার। দেড় বছরের মাথায় সেই পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় পেলেন শেখ হাসিনা। অবশ্য এর আগে গত ২ জুলাই আদালত অবমাননার একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন এই ট্রাইব্যুনাল।
আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল:
মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তিতর্কের ব্যাখ্যা তুলে ধরে রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, গত বছর ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা গণ-আন্দোলনে অভিযুক্ত তিন আসামির যৌথ প্ররোচনা, উসকানি ও নির্দেশনায় সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তাঁদের নির্দেশেই আন্দোলনকারীদের ওপর ড্রোন, হেলিকপ্টার ও মরণাস্ত্র ব্যবহার করেন পুলিশ, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা।
গত বছর ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর তাঁদের লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস-নির্মম ঘটনা প্রমাণ করে, এই আসামিদের নির্দেশে সারা দেশে ব্যাপক পরিসরে পদ্ধতিগতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা রোম সংবিধি অনুসারে স্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ। শুধু তাই না, এই তিন আসামি ঊর্ধ্বতন অবস্থানে থেকে জুলাই গণ-আন্দোলনে সংঘটিত অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। নির্দেশদাতা কর্তৃপক্ষ হিসেবে এই নিষ্ক্রিয়তা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার ব্যর্থতাও মানবতাবিরোধী অপরাধ।
কোটা সংস্কারের দাবিতে নামা আন্দোলনকারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে গত বছর ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের অপমান করেছে, তাঁদের ক্ষুব্ধ করেছে। যে কারণে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল থেকে রাস্তায় নেমে আসেন এবং বক্তব্যের জন্য তাঁকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেন।
আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট—সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেই ক্ষান্ত থাকেননি, তাঁরা হামলায় আহতদের চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা দিয়েছেন।
গত বছর ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য? মাকসুদ কামালের সঙ্গে, ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও ভাতিজা শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে এবং জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপ নিয়েও রায়ে পর্যবেক্ষণ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রোসিকিউশন এসব ফোনালাপ সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালে।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, রাষ্ট্র নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী শুনানিতে দাবি করেছিলেন, এসব ফোনালাপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা। রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী এ দাবি করলেও এ দাবির পক্ষে তিনি ট্রাইব্যুনালে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। উল্টো প্রোসিকিউশন দাবি করেছে, এসব ফোনালাপ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবে ফরেনসিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং তা শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সত্যিকারের ফোনালাপ।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, এসব ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে তাঁদের হত্যার নির্দেশ দিতে শোনা গেছে শেখ হাসিনাকে। একটি ফোনালাপে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনাও আছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যের অংশবিশেষ তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে দেশের ৪১টি জেলার ৪৩৮টি স্পটে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় সশস্ত্র নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া ৫১টি জেলায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য যত রকমের ব্যবস্থা আছে সবই গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এরই ফলে ২০২৪ সালের আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়; যাদের সবাই ছিল সাধারণ-নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করার জন্য ড্রোন, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা, এনটিএমসির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোবাইল ট্র?্যাকিং করে অবস্থান শনাক্ত করে হত্যা, জখম, গ্রেপ্তার, অন্যায় আটকের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এই আন্দোলনে আক্রমণকারীরা ছিলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য ও সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডার। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা ছিলেন সাধারণ, নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা ছিল ব্যাপক মাত্রায়, পদ্ধতিগত ও লক্ষ্যভিত্তিক।
রাজসাক্ষী হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। তাঁর সাক্ষ্য তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, গত বছর ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার কাছ থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা আসে। এই সাক্ষী তাঁর স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, সেদিন থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলেন। এর পর থেকে ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করা, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো এবং মারণাস্ত্রের ব্যবহার প্রমাণ করে এই অপরাধ ছিল ব্যাপক মাত্রায়, পদ্ধতিগত ও লক্ষ্যভিত্তিক।
আহত আন্দোলনকারী যাঁরা এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, হাত, পা, নাক, চোখ-মুখ, মাথার খুলি হারানো যেসব সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের বাস্তব অবস্থা দেখলে যেকোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। সংশ্লিষ্ট সাক্ষীসহ নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের এ রকম অবস্থার জন্য দায়ীদের যেকোনো মূল্যে বিচারের আওয়াতায় আনা উচিত।
ছয়টি অপরাধমূলক ঘটনায় দুই অভিযোগে সাজা
এরপর ট্রাইব্যুনাল রায়ের কার্যকর অংশ অর্থাৎ সাজা ঘোষণা করেন। প্রোসিকিউশনের দাখিল করা পাঁচটি অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ গঠন করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল জানান, অভিযোগ পুনর্গঠন (রিফ্রেম) করা হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচটি অভিযোগকে দুটি অভিযোগে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগটি আনা হয়েছে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে। আর তিন আসামির বিরুদ্ধে আনা হয় দ্বিতীয় অভিযোগটি।
প্রথম অভিযোগে হাসিনা-কামালের আমৃত্যু কারাদণ্ড : এই অভিযোগে তিনটি অপরাধমূলক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। ঘটনা তিনটি হচ্ছে গত বছর ১৪ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপ। সেই ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের রাজাকার সম্বোধন করে তাঁদের ফাঁসিতে ঝোলানোর হুমকি, অপরাধ সংঘটনে অধীনদের বিরত না করা এবং ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যা।
এই অভিযোগে শেখ হাসিনা ও কামালকে সাজা দেওয়ার ব্যাখ্যায় ট্রাইব্যুনাল বলেন, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা ও উসকানি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দায়ী। এসব অপরাধে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
দ্বিতীয় অভিযোগে হাসিনা-কামালের মৃত্যুদণ্ড, মামুনের ৫ বছরের কারাদণ্ড : এই অভিযোগেও তিনটি অপরাধমূলক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। ঘটনা তিনটি হচ্ছে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপে ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয় এবং আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ। গত বছর ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া।
এসব অপরাধের বর্ণনা তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, এই অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দুটি অপরাধের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি অপরাধ হচ্ছে জুলাই গণ-আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ। এই নির্দেশনা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ ৩(২)(ছ) (জ) ও ৪(১) (২) (৩) ধারার অপরাধ সংঘটন করেছেন। আর দ্বিতীয় অপরাধটি হচ্ছে শেখ হাসিনার এই নির্দেশ অনুসরণ করে রাজধানীতে গত বছর ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া।
এই অভিযোগে সাজা ঘোষণা করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে এই সব অপরাধের জন্য তাঁর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
যে যুক্তিতে মামুনের কারাদণ্ড : দ্বিতীয় অভিযোগে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে সাজা দেওয়ার ব্যাখ্যায় ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, একই অপরাধে সহ-আসামি আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সমানভাবে দায়ী। এর জন্য আসামি আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য। কিন্তু এই আসামি রাজসাক্ষী হয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন। সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশে তাঁর এই সাক্ষ্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করেছে। ফলে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত নমনীয়তা দেখাচ্ছেন। সবকিছু বিবেচনায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
রায় ঘোষণার সময় জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শহীদ মীর মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, ভাই মীর স্নিগ্ধ, মোহাম্মদপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী, যাত্রাবাড়ীতে শহীদ মিরাজের বাবা আবদুর রব। এ ছাড়া রায় শুনতে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন রাকিব হাওলাদার, নিয়ামুলসহ অন্তত ১০ জন আহত জুলাই যোদ্ধা। এ ছাড়া রায় শুনতে আসেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস ফরহাদ হোসেন, ছাত্রদলের ডাকসুর ভিপি পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম, এনসিপি নেতা আরিফুর রহমান তুহিনসহ আরো অনেকে।
এই রায় যুগান্তকারী, মাইলফলক হয়ে থাকবে—অ্যাটর্নি জেনারেল
রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় হয়েছে। এই রায়ে শহীদ পরিবার, রাষ্ট্র, প্রসিকিউশন সবাই ন্যায়বিচার পেয়েছে। শহীদদের প্রতি, দেশের প্রতি, এ দেশের মানুষের প্রতি, সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এ রায় যুগান্তকারী।
তিনি বলেন, সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা পূরণের স্বার্থে এ রায় একটি যুগান্তকারী রায়। এই রায় প্রশান্তি আনবে, এ রায় ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা। এ রায় বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আইনের বিধান মোতাবেক যেদিন পলাতক আসামিরা গ্রেপ্তার হবেন, সেদিন থেকে সাজা কার্যকর হবে। রাষ্ট্র আইনিভাবে যা করণীয়, সব করবে। শহীদদের পরিবারকে, আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য একটা নির্দেশনা আদালত দিয়েছেন। এই মামলার মধ্যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ইস্যু ছিল না বলে এই বিষয়ে রায়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো মন্তব্য করেননি।
এই রায় অতীতের কোনো কিছুর প্রতিশোধ নয়—চিফ প্রসিকিউটর
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাস সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সব আন্তর্জাতিক নর্মস, আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটির মতো কমপ্লেক্স অপরাধের বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ সাফল্যের সঙ্গে সেটা করেছে।
রায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, যে ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো আদালতের স্ট্যান্ডার্ডে এই সাক্ষ্য-প্রমাণগুলো উতরে যাবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আসামিরা একই শাস্তি পাবেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া রায় প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির প্রতিজ্ঞা। আমি মনে করি, এই রায় কোনোভাবেই অতীতের কোনো কিছুর প্রতিশোধ নয়। এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির প্রতিজ্ঞা। এটি ন্যায়বিচারের জন্য যাত্রা। এই রায় প্রমাণ করেছে অপরাধী যত বড়ই হোক, যত ক্ষমতাশালীই হোক, সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে যত বড় অপরাধী হোক, অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রথা, মান বজায় রেখে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জটিল অপরাধের বিচার করতে সক্ষম। বাংলাদেশ সাফল্যের সঙ্গে সেটা করতে পেরেছে।
রায়টা ভিন্নভাবে হলেও হতে পারত—আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী
রায়ের পর নিজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন বলেছেন, আমার ক্লায়েন্টের (হাসিনা-কামাল) বিরুদ্ধে রায়টা ভিন্নভাবে হলেও হতে পারত। কিন্তু হয়নি। এটা আমার বিপক্ষে গেছে। এ জন্য আমি কষ্ট পাচ্ছি। কারণ আমার পক্ষে এ মামলায় আপিল করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা (শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল) আত্মসমর্পণ না করবেন কিংবা গ্রেপ্তার হবেন।
মামলার আদ্যোপান্ত
রক্তক্ষয়ী লাগাতার আন্দোলনে গত বছর ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে সরকার ঘোষণা দেয়, এই অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে। ঘোষণা অনুযায়ী পরে ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল গত বছর ১৭ অক্টোবর দুই মামলার বিষয়ে প্রথম শুনানি হয়। সেদিন প্রসিকিউশনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ এই ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তার আগে গত বছর ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়। তদন্ত শুরু হয় গত বছর ১৪ অক্টোবর। ছয় মাস ২৮ দিনে তদন্ত শেষ করে গত ১২ মে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলি (ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনার দায়), হত্যা, হত্যা-চেষ্টা, ব্যাপকমাত্রায় পদ্ধতিগত হত্যা, অপরাধে প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্রসহ অন্যান্য অমানবিক আচরণ, সংঘটিত অপরাধ প্রতিহত না করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগে অভিযোগ আনা হয়।
গত ১ জুন প্রসিকিউশন ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ দাখিল করলে তা আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে আত্মসমর্পণ করতে ১৬ জুন সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন সেই বিজ্ঞপ্তি দুটি জাতীয় সংবাদপত্রে ছাপা হয়। গত ২৪ জুন শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী মো. আমির হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও আত্মসমর্পণ না করায় তাঁদের পলাতক দেখিয়ে গত ১০ জুলাই মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন আসমি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এ মামলার রাজসাক্ষী হতে ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেন। পরে তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
গত ৩ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচারকাজ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাক্ষ্য দেন এ মামলায়। রাজসাক্ষী হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য দেন আসামি চৌধুরী মামুন। গত ৮ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। টানা পাঁচ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গত ১৬ অক্টোবর প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ২০ অক্টোবর থেকে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী টানা তিন দিন শেখ হাসিনা-কামালের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ অক্টোবর পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন দুই পক্ষই। তার আগে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ট্রাইব্যুনালে সমাপনী বক্তব্য দেন। সেদিন ট্রাইব্যুনাল জানিয়ে দেন, ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে। পরে গত ১৩ নভেম্বর তা জানিয়ে দেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।