
জয়সাগর নিউজ ডেস্ক:
অবশেষে অনুমোদন পেল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুমোদন করা হয়। পরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর জাতির উদ্দেশে ভাষণে আদেশের বিষয়বস্তু ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির তথ্য তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভাষণে তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে এবং গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন থাকবে।
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবে থাকবে চারটি প্রশ্ন। গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এখানে প্রশ্নটি যেভাবে থাকবে তা হলো ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্ন লিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।
তিনি জানান, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হবার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধকে উপেক্ষা করেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি করছে সরকার। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে সমঝোতার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১০ নভেম্বর সে সময় শেষ হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় আসেনি; এমনকি কোনো আলোচনায়ও বসেনি। এ অবস্থায় সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা ঘোষণা করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ২৮ অক্টোবর সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এতে বলা হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার একটি আদেশ জারি করবে। কিন্তু আদেশ জারির আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গত ৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর আহ্বান করা হয়। কিন্তু দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। প্রকাশ্যে তারা মুখোমুখি অবস্থান নেয়। দুটি রাজনৈতিক দলের এমন মুখোমুখি অবস্থান থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে পর্দার আড়ালে চলে সমঝোতার আলোচনা। বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের জন্য কয়েকজন উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করতে সক্ষম হন। গত ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে ২৫টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের গেজেট প্রকাশ
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় লেজিসলেটিভ ও সংসদ-বিষয়ক বিভাগ থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। গতকাল দুপুরে প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানোর আগে আদেশের সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
এতে বলা হয়, সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে এবং উক্ত গণঅভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে, ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হয় এবং ৮ আগস্ট বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকারিতা ও স্বীকৃতি লাভ করেছে। রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং ওই কমিশনসমূহ নিজ নিজ প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করে। প্রতিবেদনগুলোতে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশগুলোর বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে আলোচনাক্রমে সংবিধান সংস্কারসহ অন্যান্য সংস্কারের সুপারিশ সংবলিত জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ প্রণয়ন করে এবং রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে ওই সনদে স্বাক্ষর ও তাহা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে। সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন এবং এ উদ্দেশ্যে গণভোট অনুষ্ঠান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও ওই পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার করার আবশ্যকতা রয়েছে। এজন্য জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা একান্ত প্রয়োজন। সেহেতু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করলেন। এই আদেশের (ক) ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১২ ও ১৫ অনুচ্ছেদ অবিলম্বে কার্যকর হবে, এবং (খ) ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১৩ ও ১৪ অনুচ্ছেদ গণভোটের ইতিবাচক ফলাফল সাপেক্ষে সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখে কার্যকর হবে। জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোট বিষয়ে বলা হয়: জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্ন-গণভোটে নিম্নরূপ প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ (হ্যাঁ/না) : নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ-বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য-বিশিষ্ট একটি উচ্চ কক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনী করতে হলে উচ্চ কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে: সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ব্যালটে প্রত্যেক ভোটার গোপনে ভোটদান করবেন। গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে বলা হয়: এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এই আদেশ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠান করা হবে।
গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য আইন প্রণয়ন : গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যথোপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা হবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, কার্যাবলি ও বিলুপ্তি : গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট (হ্যাঁ) সূচক হলে, এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হইবে, যাহা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, ওই নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থকে ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। পরিষদের কার্যধারায় অংশগ্রহণের সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিষদ সদস্য হিসেবে অভিহিত হবেন। এই আদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, পরিষদ ইহার অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবি, সংবিধান সংস্কার-বিষয়ক প্রস্তাব উত্থাপনের পদ্ধতি, ওই প্রস্তাব বিবেচনা ও গ্রহণ এবং অন্য সব বিষয়ে কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করিবে।
শপথ এবং শপথ-পাঠ পরিচালনা : নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সংসদ-সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর একই শপথ অনুষ্ঠানে এই আদেশের তফসিল-১ অনুযায়ী পরিষদ-সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে স্বাক্ষর দান করবেন। সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের ক্ষেত্রে যিনি শপথ-পাঠ পরিচালনা করবেন তিনিই এই আদেশের তফসিল-১ এ বিধৃত ফরমে পরিষদ-সদস্যদের শপথ-পাঠ পরিচালনা করবেন।
পরিষদের সভাপ্রধান : পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদ-সদস্যগণ ইহার সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচন করবে এবং উক্তরূপ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পরিষদের বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যর সম্মতিক্রমে বৈঠকে সভাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান উভয়ের অনুপস্থিতিতে পরিষদের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী কোনো পরিষদ-সদস্য সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, কোরাম, ভোটদান, ইত্যাদি। সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ন্যূনতম ৬০ জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে এবং অন্যান্য বিষয়ে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পরিষদে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে; তবে শর্ত থাকে যে, সমসংখ্যক ভোটের ক্ষেত্রে সভাপ্রধান নির্ণায়ক ভোট প্রদান করবেন।
পরিষদ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি : পরিষদের কোনো কার্যধারার বৈধতা এবং পরিষদ-সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি জাতীয় সংসদ ও সংসদ-সদস্যদের অনুরূপ হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ : জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংবিধান সংস্কার অবিলম্বে কার্যকর করা। এই আদেশের ৭ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (১) (গ) অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর যে সব সংস্কার অবিলম্বে কার্যকর করা সম্ভব তা অবিলম্বে কার্যকর করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকার সব যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (১) এর সামগ্রিকতাকে ক্ষুণ্ন না করে, এই আদেশের ৭ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (১) (গ) অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্য দিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের একটি উচ্চ কক্ষ গঠন করা হবে এবং তার কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হবে। এই অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুসারে গঠিত উচ্চ কক্ষের মেয়াদ ইহার শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে জাতীয় সংসদের নিম্ন কক্ষের মেয়াদের শেষ দিবস পর্যন্ত হবে। এই আদেশ জারির অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনের সময় জাতীয় সংসদের উচ্চ কক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রয়োজন হবে না। এই অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুসারে উচ্চ কক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করিবার উদ্দেশ্যে পরিষদ প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন করিতে পারিবে এবং সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারবে।
পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার চূড়ান্তকরণ ও প্রকাশ : পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সংবিধান সংস্কার চূড়ান্ত হইবে এবং উক্তরূপ সংস্কার বিষয়ে অন্য কোনোভাবে অনুমোদন বা সম্মতির প্রয়োজন হবে না। পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সংবিধান সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ পাঠ এবং উক্তরূপে সংস্কারকৃত সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ পাঠ অনতিবিলম্বে সরকার সরকারি গেজেটে প্রকাশ করবে।
সরকার কর্তৃক নির্দেশনা জারি : এই আদেশের বিধানাবলি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারবে।