মোঃ হামিদুজ্জামান জলিল স্টাফ রিপোর্টার্স।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শোয়াইব নগর কামিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমানের ওপর এক ছাত্রের বাবার বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, চলতি বছরে ১১ মাসে মাত্র ২৫ দিন ক্লাসে উপস্থিত থাকা ওই ছাত্রকে পড়াশোনার জন্য শাসন করায় তার বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে হাতুড়ি দিয়ে শিক্ষককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছেন। এই ঘটনাটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের পবিত্রতা এবং আমাদের বর্তমান সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব। বছরে মাত্র ২৫ দিন উপস্থিত থাকা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া এবং তাকে শাসন করা মোটেও অপরাধ নয়। কিন্তু সেই শাসনের প্রতিক্রিয়ায় একজন অভিভাবকের হাতে হাতুড়ির মতো মারাত্মক অস্ত্র তুলে নেওয়া প্রমাণ করে যে, সমাজে সহনশীলতার মাত্রা কতটা নিচে নেমে গেছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের ব্যবচ্ছেদ
এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি সমাজের কয়েকটি গভীর ক্ষত উন্মোচিত করেছে:
এক সময় শিক্ষক ছিলেন সমাজের আদর্শ ও দিকনির্দেশক। কিন্তু বর্তমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও নৈতিক স্খলনের ফলে শিক্ষককে এখন সাধারণ প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
সন্তানের ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া বা তাদের অন্যায়ের পক্ষ নেওয়া অভিভাবকত্বের চরম ব্যর্থতা। নিয়মিত ক্লাসে না আসা শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়ে শিক্ষককে আক্রমণ করা মূলত ওই সন্তানের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের নামান্তর।
তুচ্ছ কারণে আইন হাতে তুলে নেওয়া এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। আলোচনার চেয়ে আঘাত করাই এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে শাসন করতে গিয়ে এভাবে আক্রান্ত হন, তবে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের নৈতিক বা একাডেমিক তদারকি করার ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। এতে করে একটি আদর্শহীন ও বিশৃঙ্খল প্রজন্ম তৈরি হবে, যা পুরো জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন:
শিক্ষককে লাঞ্ছনাকারী ওই অভিভাবকের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে অন্য কেউ এমন সাহস না পায়।
অভিভাবকদের সচেতন করতে নিয়মিত সভা করা এবং শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝানো।
স্থানীয় প্রশাসন (যেমন UNO) এবং সুশীল সমাজকে এই ধরণের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।শিক্ষককে হাতুড়িপেটা করার অর্থ হলো একটি জাতির মেরুদণ্ডকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা। আজ যদি আমরা এই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হই, তবে কাল আমাদের পুরো সমাজই অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।



















