মাসুদ রানা বাচ্চু সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
তীব্র শীত উপেক্ষা করে গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সিরাজগঞ্জের যমুনা পাড়ের আখ চাষিরা। শীত মৌসুম এলেই শুরু হয়ে যায় সুস্বাদু আখের গুড় তৈরির কাজ। একদিকে আখ কেটে সংগ্রহ করা হচ্ছে, অন্যদিকে কেটে আনা আখ থেকে মেশিনের মাধ্যমে রস সংগ্রহ করে সেই রস জাল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গুড়।
শীত বাড়তেই বাঙালির ঘরে শুরু হয়েছে পিঠা-পুলির মহোৎসব। এসব পিঠায় আখের গুড়ের কদর রয়েছে ব্যাপকহারে। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকষাবাড়ি
ও ছোনগাছা ইউনিয়নের যমুনা চর এলাকায় ও পাচ ঠাকুরি গ্রামের মাঠে দেখা যায়, আখের গুড় তৈরিতে ব্যস্ত চাষিরা।
দীর্ঘ বছর ধরে এই এলাকায় শীত মৌসুমে আখ থেকে গুড় তৈরি করেন তারা। তবে আগের মতো আখচাষ না থাকায় তেমন একটা চোখে পড়ে না রস থেকে গুড় তৈরির দৃশ্য।
সরেজমিন দেখা যায়, গ্রামের চাষিরা আখ থেকে পাতা ও আগা বাদ দিয়ে আলাদা করে রাখছেন। সেই পাতা ও আগার অংশটুকু নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে গৃহপালিত পশুর খাবার হিসেবে। এরপর রেখে দেওয়া আখ থেকে কারিগররা একটি মেশিনের মাধ্যমে রস বের করছে।
তার পাশেই একটি বিশাল চৌকা তৈরি করে তার ওপর বসানো হয়েছে বিশাল মাপের লোহার কড়াই। তাতেই আখের রস ঢেলে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। সেই কড়াইয়ের দিকে সজাগ নজর কারিগরদের। কারিগররা প্রায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা রস জ্বাল দেন। পরে তা চুলা থেকে নামিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট রাখার পর শক্ত হয়। পরে কারিগরদের হাতের সাহায্যে শক্ত গুড়গুলোকে একটি নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি করা হয় আখের রস থেকে সুস্বাদু গুড়।
স্থানীয় আখচাষিরা জানান, এখানকার গুড় নির্ভেজাল ও খাঁটি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চাষে খরচ কম ও তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর আখের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে কৃষি অফিসের সহযোগিতা পেলে উপজেলায় আখ ও গুড়ের উৎপাদন বাড়বে।
আখের গুড় তৈরির কারিগর আবু হাসেম বলেন, আমরা নদী ভাংগন এলাকার লোক তেমন কোন কাজ নেই। আমি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই পেশায় আছি। শীত মৌসুমের শুরু থেকেই আমরা মহাজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আখের রস থেকে গুড় বানানোর কাজ করি। আখ কাটা থেকে শুরু করে গুড় তৈরি পর্যন্ত প্রায় এক মাস এখানে থাকতে হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ শত টাকা পারিশ্রমিক পাই। এতে করে কোনো রকম ডাল-ভাত খেতে পারি।
আখচাষি আব্দুল মমিন তালুকদার বলেন, আমি এ বছর চাস করেছি ছয় বিঘা। এ বছর বন্যা না থাকায় মোটামুটি লাভের মুখ দেখতে পারবো। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় গুড় সরবরাহ করা হয় সিরাজগঞ্জ থেকে। সরকারি প্রণোদনা পেলে আখের গুড় উৎপাদন বাড়াতে পারবেন বলে আশা করেন প্রান্তিক কৃষকরা।
আখ চাষি সিপন সেখ বলেন, আমি নিজের জমিতে চাষ করেছি ৫ বিঘা আর অন্য আখের মালিকদের কাছ থেকে ২৫ বিঘা ক্রয় করেছি ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে। দুই মাস আগেই টাকা দিয়েছি আর দুই মাস লাগবে গুড় বানোর কাজ শেষ করতে। আশা করছি ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা লাভ হবে।
আখ মাড়াই কাজে যারা নিয়োজিত তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আখের রস জ্বাল দেওয়ার পর তা ঘন হয়ে উঠলে টিনের তৈরি ড্রামের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়। উত্তাপ কমে এলে ২থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে গুড় জমাট বাঁধে।
আখের মান ভালো হলে প্রতি খোলা (গুড় জ্বাল দেওয়ার কড়াই) থেকে ৪০-৫০ কেজির মতো গুড় পাওয়া যায়। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চার-পাঁচটি গুড়ের খোলা ওঠানো সম্ভব হয়। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আলিমুল হক জানান, চলতি মৌসুমে সদর উপজেলায় ৯ শো ৯০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছে।
আখচাষিদের জন্য সরকারি কোনো প্রকার বরাদ্দ না থাকায় আমরা তাদের শুধু পরামর্শ দিয়ে থাকি।
কিন্তু ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের জন্য সরকারি ভাবে বরাদ্দ এসেছে । আমরা প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষক দের আরও উৎসাহিত করব, যেন কৃষকেরা আখ চাষে আগ্রহী হয়।



















