জয়সাগর নিউজ ডেস্ক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ৫১ দফা ইশতেহারে ৯টি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইশতেহারে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। যুবক ও তরুণদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে ইশতেহারে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে প্রণীত ইশতেহারে বলা হয়েছে সংবিধান সংস্কারে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশ ও জনগণের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই অন্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কথাও বলেছেন তিনি।
গতকাল বিকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট নাগরিক, কূটনীতিক ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিকাল ৩টা ৩২ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপরে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’- স্লোগানে ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি
এগুলো হলো- ১. প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে, ২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন, ৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে,
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে, ৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফরমে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে, ৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে, ৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে, ৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে, ৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশ গঠন: মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় বিএনপি’র মূলমন্ত্র হবে ‘ন্যায়পরায়ণতা’। মহানবীর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শে উজ্জীবিত ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: এমন একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করা হবে, যেখানে কোনো মত, বিশ্বাস বা পরিচয় অবমূল্যায়িত হবে না। মুক্ত ও নিরাপদ মত প্রকাশ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং বাধাহীন চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে বলা হয়, ১. সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ই অক্টোবর ২০০২৫ইং তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
২. ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। বিএনপি সকল বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও বিধানাবলী পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে। রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার সাধন করা হবে।
৩. বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি।
৪. একজন উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃজন করা হবে এবং তিনি রাষ্ট্রপতির মতোই নির্বাচিত হবেন।
৫. একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যত বারই হোক, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বছর অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদেও অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন।
৬. রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন করা হবে।
৭. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
৮. সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। রাজনৈতিক দলসমূহ নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।
৯. আইনসভার উভয়কক্ষে দু’জন ডেপুটি স্পিকারের মধ্য থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার সরকারদলীয় ব্যতীত অন্যান্য সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে।
১০. নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রয়োজন হবে না। উচ্চকক্ষে কমপক্ষে ১০% নারী সদস্য থাকবেন।
১১. আস্থাভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত (যেমন: যুদ্ধ পরিস্থিতি) এমন সব বিষয় ব্যতীত অন্যসব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে।
১২. সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল, আস্থাভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ইত্যাদি ছাড়া অন্যসব বিল উচ্চকক্ষে প্রেরণ করা হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল সর্বোচ্চ ১ (এক) মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।
১৩. আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনকালে জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সম্পাদিত চুক্তি সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত করা হবে।
১৪. দক্ষ, নিরপেক্ষ, প্রহণযোগ্য ও দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়ন করা হবে।
১৫. সরকারি কর্মকমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের জন্য এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সকল সেক্টরে) নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে।
১৬. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ আইনানুসারে সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন।
১৭. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুইজন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ প্রদানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হবে।
১৮. রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে। তবে, প্রধান বিচারপতি প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
১৯. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অধিকতর শক্তিশালী ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।
২০. অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।
২১. আইনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে স্থায়ী প্রসিকিউশন অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২২. জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এসব কমিটিসহ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে প্রান্ত আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। ২৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সংবিধানে এরূপ বিধান যুক্ত করা হবে যে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। ২৫. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরূপ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে। ২৬. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এরূপ প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক যথাযথ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। ২৭. পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং পুলিশি সেবাকে জনবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। এতদসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি প্রয়োজনীয় সংস্কার পর্যালোচনার মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে। ২৮. একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন করার বিষয়টি সংসদে পর্যালোচনা করে দেখা হবে।
২৯. জুলাই অভ্যুত্থানকালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। ৩০. ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। ৩১. ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বিএনপি আমলে সৃষ্ট ‘কর ন্যায়পাল’ পদটি বেশ কার্যকর বলে বিবেচিত হয়েছিল। ৩২. বেসরকারি খাতের দুর্নীতি তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৩১ দফা ঘোষিত ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর আলোকে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করা হয় ইশতেহারে।
ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, সুশাসন হলো গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি হবে ইনসাফ। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা বিএনপি’র সুশাসন দর্শনের মূল। ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টক্ষতের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে দুদকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। দুদক সংস্কার সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গৃহীত সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয় বলে বিএনপি মনে করে।
অর্থ পাচার রোধ ও ফ্যাসিস্ট আমলের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার বিষয়ে বলা হয়, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ায়ী আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে।
আইনের শাসন বাস্তবায়নের বিষয়ে বলা হয়, বিএনপি আইনের শাসন বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে বিএনপি মানবিক মূল্যবোধ ও মানুষের মর্যাদায় বিশ্বাসী।
ইশতেহারে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আমলে গুম-খুনের শিকার হয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের নামে গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শহীদদেরকে গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে। গত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গুম হওয়া মানুষদের তালিকা সংবলিত একটি কেন্দ্রীয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। জুলাই স্মৃতিসৌধকে ‘কেন্দ্রীয় জুলাই স্মৃতি সৌধ’-এর সরকারি স্বীকৃতি দেয়া হবে।
সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সংস্থায় প্রায় পাঁচ লাখের অধিক সরকারি কর্মচারীর পদ শূন্য আছে। যতদ্রুত সম্ভব সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধাবী তরুণ-তরুণীদের সকল শূন্য পদে নিয়োগ দেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়, যথাসময়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় ইশতেহারে। বিএনপি মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কারসমূহ যথেষ্ট নয়। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ পরিষেবা ও জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে জনপ্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে নিয়মিত দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সকল সেক্টরে। নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করা হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর ও স্বতন্ত্র স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে মামলা জট কমিয়ে আনা হবে। মানুষ যাতে বিচারপ্রাপ্তিতে বৈষম্য ও অযথা বিলম্বের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিচার প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে পূর্ণ ইলেকট্রনিক/অনলাইন ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করা হবে। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কেবলমাত্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, বিচারবোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করে বিচারক নিয়োগ করা হবে। সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের জন্য সংবিধানের ৯৫(২)(গ) অনুযায়ী ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন করা হবে। বর্তমান বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে। অধস্তন আদালত সমূহের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত করা হবে। বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে।
ইশতেহারে বলা হয়, পুলিশ বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা হবে। জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব পুলিশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশের মোটিভেশন, ট্রেইনিং ও নৈতিক উন্নয়নে যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সিআরপিসি, পিআরবি, পুলিশ আইন এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী পুলিশের উপর বিচার বিভাগীয় তদারকি নিশ্চিত করে জবাবদিহি, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমূলক পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে।
সামাজিক সুরক্ষা: ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি মানবিক, ন্যায়সঙ্গত ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করছে, যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। বিএনপি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে দিবে ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করবে। প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এই কার্ড মূলত পরিবারের নারী প্রধান যথা মা ও বোনদের নামে ইস্যু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে বিএনপি সরকার দিবে প্রতি মাসে ২,০০০-২,৫০০ টাকার আর্থিক প্রয়োজনীয় পণ্য। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।
কৃষক কার্ড ও কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা: কৃষকের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা এবং স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি, স্বল্প ব্যয়ে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্য মূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা ও কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ পাওয়া যাবে। তাছাড়া, কৃষক কার্ড দিয়ে মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, মোবাইলে ফসলের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাবে। মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও কৃষক কার্ডের সুবিধা পাবেন। এর পাশাপাশি, কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সহায়তা পাবেন। প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ডাটা বেইস গড়ে তুলে রাষ্ট্রীয় সমর্থন পাওয়ার যোগ্য প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করা হবে।
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ: ইশতেহারে বলা হয়, সার, বীজ, তেল, বিদ্যুৎ, সেচের পানিসহ কৃষি উপকরণের দাম বেড়েই চলছে। কিন্তু খেটে খাওয়া কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অন্যদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রের দাম ফ্যাসিস্ট আমল থেকে দ্রুত বেড়েই চলেছে। জনজীবনে কোনো স্বস্তি নাই। জনগণের সরকার হিসাবে শস্য, ফসল, মৎস্য, ও পশুপালন খাতে গৃহীত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদ সহ মওকুফ করা হবে।
এছাড়া বেকার ও চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য কর্মসংস্থান প্ল?্যাটফর্ম গঠনের লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা চালু করা হবে উল্লেখ করা হয়।
বেকারভাতা প্রদান: শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত (যা আগে ঘটবে ভিত্তিতে) বিশেষ আর্থিক ভাতা প্রদান করা হবে।
সবার জন্য ইন্টারনেট সুবিধা: কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসা, হাইস্কুল, সরকারি অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরসহ নির্দিষ্ট জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট চালু করে তথ্যের আদান-প্রদান, আধুনিক সেবা গ্রহণ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও সহজ করা হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষা ও মানব সম্পদ উন্নয়ন: ইশতেহারে বলা হয়, শিক্ষা খাতে জিডিপি’র পাঁচ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে। এই অর্থ কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকের শিক্ষাদান ও দক্ষতার ওপর জোর দেয়া হবে। তাদের যথাযথ ট্রেনিং দেয়া হবে। প্রযুক্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাসামগ্রীর উন্নয়নে জোর দেয়া হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ভবিষ্যতে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি’র পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ: স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপি’র পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, প্রতিটি মানুষ চিকিৎসা পাবে তার প্রয়োজন অনুযায়ী, সামর্থ্য অনুযায়ী নয়। ই-হেলথ কার্ড: প্রত্যেক নাগরিককে একটি ইলেকট্রনিক হেলথ (ই-হেলথ) কার্ড প্রদান করা হবে, যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গেলে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের তথ্য দেখতে পারবেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ও স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে চিকিৎসা থাকবে সবার নাগালে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা-সুশৃঙ্খল ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী: ইশতেহারে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনী সাহস, শৌর্য ও শৃঙ্খলায় গড়ে ওঠা জাতির এক গর্বিত প্রতিষ্ঠান। বিএনপি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে একটি আধুনিক, ক্ষিপ্র, সদা প্রস্তুত ও শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেবে। সশস্ত্র বাহিনীর স্বকীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে একে সকল রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হবে।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুগোপযোগী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও চতুর্মাত্রিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা (ক্রেডিবল ডিটারেন্স) নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র বাহিনীর বিরাজনীতিকরণ এবং পেশাদারিত্ব জোরদার করার জন্য বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
পররাষ্ট্রনীতি: ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি’র পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন- ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বিএনপি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইবে বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই। পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে।
বলা হয়, বিএনপি সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী, পারস্পরিক দানের স্বীকৃতি ভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ-প্রবাসী কার্ড: প্রবাসীদের প্রবাসী কার্ড’ দেয়া হবে উল্লেখ করে ইশতেহারে বলা হয়, যাতে তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষণ থাকবে। ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়েতে যুক্ত থাকবে, থাকবে সহজ রেমিট্যান্স প্রেরণের সুবিধা। রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা পাওয়া মানে এবং দেশে ফেরত প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা হবে।
ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আজকে থেকে ৪৭ বছর আগে দেশ এবং জনগণের প্রয়োজনে বিএনপি’র জন্ম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিএনপি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছেন। তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্যক্তি ও বাক-স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছেন। স্বাধীনতার পর একটি দুর্নাম ছিল। সেই দুর্নাম থেকে তিনি দেশকে স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। তার শাহাদতবরণের পরই দেশে স্বৈরাচারের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছিল। দেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন তিনি। নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি দেশের নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। ২০০১ সালে তৃতীয় বারের মতো দায়িত্ব পেলে তিনি অর্থনীতিকে বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান দেশের তালিকায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদি শাসনামলে জনগণের সকল ক্ষমতায় কেড়ে নেয়া হয়েছিল। দেশকে করা হয়েছিল একটি তাঁবেদার রাষ্ট্রে। দেশের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করা হয়েছিল। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। এবার বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পালা। বিশ কোটি মানুষের জন্য বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক নিরাপদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পালা। বাংলাদেশকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করার জন্য বিএনপি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশ ও জনগণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাকে আমি বলেছিলাম আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান। এই পরিকল্পনায় দেশের চার কোটি তরুণ, দেশের অর্ধেক নারী, কোটি কোটি কৃষক শ্রমিকের জন্য। দেশের এবং বিদেশে কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রতিটি সেক্টরভিত্তিক একটি কর্মপরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করেছি।
ইশতেহার ঘোষণার এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। অনুষ্ঠানে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মিডিয়ার সম্পাদক-সিনিয়র সাংবাদিক, নানা শ্রেণি-পেশার নাগরিক এবং চীন, পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া বৃটেনসহ ৩৮টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।



















