জয়সাগর নিউজ ডেস্ক:
পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল সার্বভৌমত্বকে নস্যাতের একটি অপপ্রয়াস বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পিলখানা ঘটনার পরিক্রমায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা ফুটে ওঠে। তাই বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও আধুনিক, সময়োপযোগী ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমাদের সরকার কাজ করবে। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে তাদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি।
গতকাল সেনানিবাসের মাল্টি পারপাস হলে জাতীয় শহীদ সেনা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং তাঁর মেয়ে জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় শেষে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মানে ইফতারে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের তিনজন প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন এবং ১৭ বছর আগে নৃশংস গণহত্যায় তাদের প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা ও যন্ত্রণা ভাগ করে নেন। তারা পিলখানায় হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের শহীদ আখ্যা দিয়ে গেজেট প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জানতে চান। পাশাপাশি জাতীয় শহীদ সেনা দিবসকে ‘সি’ গ্রেড থেকে ‘এ’ গ্রেড করার দাবি তোলা হয়। এ ছাড়া ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতো আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। ২০০৯ সালের সেই বিভীষিকাময় ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ৭৪টি প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প, প্রিয়জন হারানোর বেদনাবিধুর অধ্যায়, একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য।
তারেক রহমান বলেন, আমি দেশে প্রত্যাবর্তনের পরপরই বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছি- গত ১৭ বছরে আপনাদের দুর্বিষহ সংগ্রাম, অপরিসীম ত্যাগ আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পাওয়ার নিদারুণ যন্ত্রণা। আমি বিশ্বাস করি, পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই সেনাবাহিনী ও আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বর্তমান সরকার কাজ করবে।
তিনি বলেন, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শিকড় আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রোথিত। ১৯৭১ সালের যেদিন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন সেদিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে তদানীন্তন ইপিআরের সদস্যবৃন্দ বেতার কেন্দ্রে দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে চলেছেন। পরবর্তীকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সুসংহত করতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শুরু করেন। সেনাবাহিনী থেকে যোগ্য ও মেধাবী অফিসারদের প্রেষণে প্রেরণের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৭৮ সালে এই বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো সামরিক কায়দায় নতুন করে পুনর্গঠিত হওয়া। আগের উইংগুলোকে পরিবর্তন করে ব্যাটালিয়নে রূপান্তর করা হয়। দুটি নতুন ব্যাটালিয়ন সংযোজন করে বাহিনীর সংগঠনকে পরিবর্ধিত করা হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। দেশের প্রশ্নে আমরা সীমান্ত বাহিনীকে আরও আধুনিক ও সুসংহত করব। আমাদের সদস্যরা দেশপ্রেম ও পেশাগত উৎকর্ষতায় সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কমিশনের সুপারিশের কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরে বলেন, তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বরাই এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত ছিলেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী এ কাজের জন্য দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হত্যাকারীদের সমর্থনে মিছিল করা থেকে শুরু করে তাদের খাদ্য সরবরাহ করা ও পালানোর সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগের কর্মীরা সবাই ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকারীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সকল প্রকার সহায়তা করেছে। এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা কমিশনের এসব সুপারিশের সঙ্গে একমত। কমিশন যে সুপারিশ করেছে তা বাস্তবায়ন করব ইনশা আল্লাহ। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক কলঙ্কজনক দিন। ওইদিন যে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিা তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। পিলখানার ঘটনার পর শহীদ পরিবারের যে সংগ্রামী জীবন শুরু হয়েছিল তা মসৃণ ছিল না। শহীদদের প্রতিটি সন্তান আমাদেরই সন্তান। সেনাবাহিনী সর্বদা তাঁদের সর্বাত্মক সহযোগিতা নিশ্চিত করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।



















