
জয়সাগর স্পোটর্স ডেস্ক:
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন হামজা চৌধুরী। তাকে ঘিরেই উল্লাসে ফেটে পড়লেন সোহেল রানা-তপু বর্মণরা। এই উল্লাস ২২ বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর। ২২ বছর পর এই জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতকে হারিয়ে উল্লাসের উপলক্ষ এনে দিয়েছেন শেখ মোরসালিন। তার একমাত্র গোলেই এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে ভারতকে হারিয়ে একমাত্র জয়টি পেলো বাংলাদেশ। এই জয়ে এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে পাঁচ ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৫ পয়েন্ট। সমান ম্যাচে দুই ড্র’তে ২ পয়েন্ট ভারতের। হামজা চৌধুরী-শমিত সোমের আগমনের পর থেকেই জয়টা আসি আসি করেও আসছিল না। যার শুরুটা হয়েছিল শিলংয়ে ভারত ম্যাচের মধ্যদিয়ে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে প্রায় ৫০ ধাপ এগিয়ে থাকা স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ওই ম্যাচে দারুণ কিছু সুযোগ পেয়েও গোলশূন্য ফিরতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ঢাকার ম্যাচে ভালো ফুটবল খেলেও গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাস্যকর ভুলে হারতে হয়েছিল ২-১ ব্যবধানে। হংকংয়ের বিপক্ষে দু’টি ম্যাচেই জিততে পারতো বাংলাদেশ। কিন্তু ফলাফল পক্ষে আসেনি। ঢাকায় ৪-৩ গোলে হারের পর হংকং থেকে ১-১ গোলে ড্র নিয়ে ফেরেন হামজা-শমিতরা। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত জয় ধরা দিয়েছে। ভারতের বিপক্ষে জয় এসেছে দীর্ঘ ২২ বছর পর। দীর্ঘ এই সময়ে ভারতের বিপক্ষে ১০টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। যার মধ্যে ছয়টি ড্র করতে পারলেও হারতে হয়েছিল চার ম্যাচে। সবশেষ ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ জেতে ২০০৩ সালের ১৮ই জানুয়ারি ঢাকায়। ওই ম্যাচে ২-১ গোলে জয় পায় বাংলাদেশ। গোল দু’টি করেন কাঞ্চন ও মতিউর মুন্না। ২০০৩ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতকে হারানোর আসরে বাংলাদেশ প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সাফে। ফাইনালে হারায় মালদ্বীপকে। কাল জেতালেন শেখ মোরসালিন।
এদিন নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের একাদশে দু’টি পরিবর্তন আনেন কাবরেরা। অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকে বাইরে রেখে শেখ মোরসালিনকে সুযোগ করে দেন এই স্প্যানিশ কোচ। জুনিয়র সোহেল রানার জায়গায় সুযোগ হয় শমিত সোমের। গতকাল নিজের চিরচেনা জায়গা হোল্ডিং মিডফিল্ডেই শুরু করেন হামজা চৌধুরী। বাংলাদেশের শুরুটা হয় রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে। এই সুযোগে বামপ্রান্ত দিয়ে বেশ কয়েকবার আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে ভারত। তবে কাউন্ডার অ্যাটাক থেকে ১১তম মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায় বাংলাদেশ। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে রাকিব হোসেনকে বল বাড়ান শেখ মোরসালিন। দুই ডিফেন্ডারকে ছিটকে বক্সে আবার মোরসালিনের উদ্দেশ্যে কাটব্যাক করেন রাকিব। তা থেকে ভারতীয় ডিফেন্ডার আকাশ মিশ্রাকে ছিটকে গোলরক্ষক গুরপ্রিত সিং সান্দুকে পরাস্ত করেন বাংলাদেশের এই উইংগার। এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে মোরসালিনের সপ্তম গোল। পরের মিনিটে রাকিবের ক্রসে পা ছোঁয়াতে মোরসালিন ব্যর্থ হলে ব্যবধান বাড়েনি। এগিয়ে গিয়েই ম্যাচের কন্ট্রোল নেয়ার চেষ্টা করে স্বাগতিকরা। বিশেষ করে সোহেল রানা ও শমিত সোম মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেন। এতে দুই উইং দিয়ে রাকিব হোসেন ও ফাহিম বেশ কয়েকটি বল ফেলেন বক্সে। তবে তা থেকে ফায়দা তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। ম্যাচের ২৭তম মিনিটে ব্যথা পেয়ে মাঠ ছাড়েন তারিক কাজী। তার জায়গায় শাকিল আহাদ তপুকে মাঠে নামান কাবরেরা। ম্যাচের ৩০তম মিনিটে হঠাৎ করে এক ব্যাকপাসে বিপদ ডেকে এনেছিল বাংলাদেশ। গোলরক্ষক মিতুল মারমার ভুলে গোল প্রায় খেয়েই বসেছিল স্বাগতিকরা। তবে ত্রাতা হয়েছেন হামজা চৌধুরী। ভারতীয় লালিয়ানজোয়ালা চাংচোর ক্রস হেড করে ক্লিয়ার করে এই মিডল্ডিার। ম্যাচের বয়স যখন ৩৪ মিনিট, মাঠে হঠাৎ উত্তেজনা। তপু বর্মণের সঙ্গে ভারতের বিক্রমের সংঘর্ষে উত্তেজনা ছড়ায় দুই দলের খেলোয়াড়দের। যা হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছায়। রেফারি তপু ও বিক্রম দু’জনকেই হলুদ কার্ড দেখান। ম্যাচের ৪৪ মিনিটে সাদ উদ্দিনের বাড়ানো বল হেডে ক্লিয়ার করেন ভারতীয় ডিফেন্ডার আনোয়ার আলী। ফিরতি বলে হামজার শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ঠ হয়। দ্বিতীয়ার্ধেও শুরুতে কিছুটা সুসংঘতি হয়ে খেলতে থাকে ভারত। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর সাত মিনিটে দু’টি সুযোগও তৈরি করেছিল ভারত। তবে ফরোয়ার্ডদের ব্যর্থতায় তা থেকে গোল পায়নি তারা। ৭০ মিনিটে জোড়া পরিবর্তন আনেন কাবরেরা। শেখ মোরসালিন ও জায়ান আহমেদের পরিবর্তে শাহারিয়ার ইমন ও তাজ উদ্দিন মাঠে নামেন। এক গোলে পিছিয়ে পরা ভারত বাংলাদেশের রক্ষণে চাপ বাড়ায়। তবে তপু-শাকিলদের নিয়ে গড়া রক্ষণ তা সামাল দেন ভালোভাবেই। ৭৮তম মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বল দিয়ে একাই পোস্টে ডুকে শট নেন শাকিল আহাদ তপু। বামদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা রক্ষা করেন ভারতের গোলরক্ষক গুরপ্রিত শিং সান্দু। ৮১তম মিনিটে শাহারিয়ার ইমনের ক্রস সদ্বেশ জিঙ্গান কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন। যদিও পেনাল্টির আবেদনে ফিলিপাইনের রেফারিকে ঘিরে ধরেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। পরে শমিত সোমের কর্নার হেডে ক্লিয়ার করে কাউন্টার অ্যাটাকে যায় ভারত। তবে দুই তপুর করা মার্কিয়ে রহীম আলি সুবিধা করতে পারেনি। তবে যোগ করা ৬ মিনিটে ভারত চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশও কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু ব্যবধান বাড়াতে না পারলেও বিজয়ের হাসি হেসে মাঠ ছাড়ে স্বাগতিকরা।
বাংলাদেশ দল (শুরুর একাদশ): মিতুল মারমা (গোলরক্ষক) তপু বর্মণ, তারিক কাজী, জায়ান আহমেদ, সাদ উদ্দিন, হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, সোহেল রানা, শেখ মোরসালিন আহমেদ, ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ও রাকিব হোসেন।