
জয়সাগর নিউজ ডেস্ক:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, প্রিয় বাংলাদেশকে আমরা গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবো। ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীর নির্বাচনী জনসভায় পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে গতকাল শুক্রবার দুপুরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ওরা জনগণের প্রতি পাঁচ বছরে একবার দরদের হাড্ডিতে জ্বাল দিয়ে উঠিয়ে দেয়, বাকী সময় আর চার বছর হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ আবার বসন্তের কোকিল, বসন্তকাল আসলে বলে কুহ কুহ। উরে আসে জুরে বসে মানুষের সাথে তৃণমূলের সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নাই। আমরা এই রাজনীতিকে ঘৃণা করি। আমরা ছিলাম আছি থাকবো। দেশবাসীকে ফেলে কোথাও আমরা যাইনি, আগামীতেও দেশবাসীকে ফেলে কোথাও আমরা যাবোনা। জীবনে মরণে এক সাথে লড়াই করবো। প্রিয় বাংলাদেশকে আমরা গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবো। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা এবার ভোট দেবার জন্য চঞ্চল হয়ে আছেন, মরুভূমি হয়ে আছেন, আপনার ভোট যদি কেউ
ডাকাতি করতে আসে, তাহলে রুখে দিতে হবে। যুবকরা কাজ শেষ হয়নি কেবল শুরু হয়েছে। এদেশ থেকে বৈষম্য অবিচার, দুর্নীতি চাদাবাজি দখলদারি আধিপত্য বাদ মুক্ত ন্যায় ইনসাফ ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত, আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। আমরা থামবো না। আমাদেরকে কেউ থামাতে পারবেনা।
জামায়াতে আমীর বলেন, আমাদের হাতে কোনো কার্ড নাই। আপনাদের বুকে ভালবাসার কার্ড চাই। সমর্থন দোয়া ও ভালবাসা আমাদের কার্ড। উত্তরবঙ্গ সারাদেশে খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে, আজ সেই উত্তরবঙ্গকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে ইচ্ছা করে। আমি তার স্বাক্ষী হতে এসেছি। উত্তরবঙ্গ থেকে আমরা কোনো বেকারের মুখ দেখতে চাই না। আমরা সকলের হাতে মর্যাদার কাজ দিতে চাই।
আমাদের প্রত্যক যুবক-যুবতী, প্রত্যেকটা নাগরিককে দেশ গড়ার কারিগড় হিসেবে তৈরি করতে চাই। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষি ভিত্তিক রাজধানী হিসেবে দেখতে চাই। বন্ধ চিনিকল খোলা দেখতে চাই।
বক্তব্য শেষে জামায়াতের আমির পঞ্চগড়-১ আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলমকে শাপলা কলি প্রতীক ও পঞ্চগড়-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শফিউল আলম (সফিউল্লাহ সুফি) কে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক হাতে তুলে দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।
জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পঞ্চগড় জেলা আমীর মাওলানা মো. ইকবাল হোসাইন এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলম, ১০ দলীয় জোট সমর্থিত ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শফিউল আলম (শফিউল্লাহ সুফি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।
পঞ্চগড় জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন এর সঞ্চালনায় এ সময় আরো বক্তব্য দেন, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত স্থানীয় নেতারা। জনসভা শুরুর আগে সকাল থেকে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জনসভায় যোগ দিয়ে, জনস্রোতে পরিণত হয় সভাস্থল।
এদিকে, রফিক মুহাম্মদ স্টাফ রিপোটার ও মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে : ঠাকুরগাঁওয়ে ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী দিনে আল্লাহর মেহেরবানিতে জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা কোনো ধরনের বৈষম্য করব না, আল্লাহকে ভয় করে দেশ পরিচালনা করব।
জনসভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও পঞ্চগড়-১ আসনের এমপি প্রার্থী সারজিস আলম, জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধানসহ বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গকে বলা হয় বাংলাদেশের শস্যভা-ার। দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ এই অঞ্চলেই উৎপাদিত হয়। যারা সারা দেশের মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করে, তারা কখনো গরিব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজ ও ধুরন্ধরদের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ যুগের পর যুগ বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কারণে উত্তরবঙ্গের যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা ও ইনসাফভিত্তিক শাসন থাকলে উত্তরবঙ্গ আজ বাংলাদেশের কৃষির রাজধানী হতো।
তিনি আরো বলেন, কৃষকদের যদি সহজ শর্তে, বিনা লাভে ঋণ দেওয়া হতো, তাহলে তিনগুণ ফসল উৎপাদন সম্ভব হতো। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালিত হলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেত এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা আর তাদের ঘাম ঝরানো ফসল লুটে নিতে পারত না। কৃষিপণ্যের অপচয় রোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে আধুনিক সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে।
ঠাকুরগাঁওবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এবার শুধু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নয়, মুক্তিকামী মানুষের ১০ দলীয় ঐক্যের একটি ঠিকানাকে ভোট দিন। আমরা একা বাংলাদেশ গড়তে পারব না। ঐক্যবদ্ধ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।
তিনটি শর্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে হলে এই তিনটি শর্ত মানতে হবে-
১. কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না এবং দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় দেওয়া যাবে না।
২. গরিব-ধনী, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বিচার বিভাগে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না; বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে।
তিনি বলেন, ৫৪ বছরের পচাগলা রাজনীতি ও বৈষম্য পরিবর্তন করতে হলে সকল ধরনের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে।
আমীরে জামায়াত বলেন, যারা চাঁদাবাজদের সমর্থন করে না এবং নিজেরাও চাঁদাবাজিতে জড়িত নয় বরং চাঁদাবাজদের রুখে দিতে শপথবদ্ধ-তাদেরই নির্বাচিত করুন। যাদের হাতে কোনো ধর্মগুরু, কোনো ধর্ম বা বর্ণের মানুষ নির্যাতিত হবে না। যারা ক্ষমতায় গেলে বিদেশে বন্ধু খুঁজবে, কিন্তু প্রভু বানাবে না। ঐক্যভিত্তিক সমাজ গড়ার শপথ নেওয়া সেই ১০ দলীয় ঐক্যকেই নির্বাচিত করুন।
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আল্লাহর মেহেরবানিতে সরকার গঠন করতে পারলে উত্তরবঙ্গকে গৌরবের কৃষির রাজধানীতে রূপান্তর করা হবে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে, যাতে শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং কৃষিভিত্তিক পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে। এ অঞ্চলের যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরকে একটি করে ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করা হবে, ইনশাআল্লাহ। বিদেশিরা পারলে আমরাও পারব।
তিনি আরো বলেন, চাকরিতে প্রবেশের আগে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করে তাকে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। আমরা বেকারভাতা দিতে চাই না, কাজ দিতে চাই। বেকারভাতা অপমানজনক, আমরা সম্মানের চাবি তুলে দিতে চাই। আমরা জাতিকে বেকার বানাতে চাই না। জনসভায় আমীরে জামায়াত ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি সংসদীয় আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। তারা হলেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মো. দেলোয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনে মাওলানা আব্দুল হাকিম এবং ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে মাস্টার মিজানুর রহমান। এ সময় তিনি তাদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, কিছু দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজের হাতে দেশের উন্নয়ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পিলখানা, হেফাজত, সাঈদী হত্যাকা-সহ বিভিন্ন ঘটনার বিচার জনগণ পায়নি। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশের আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। শহীদ আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে দেশের মুক্তির পথ সুগম করেছেন।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজরা মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রকাশ্যে পাথর দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। সিন্ডিকেটের হাতে বাংলাদেশ আবারও বন্দী হয়ে পড়েছে। তেজগাঁও কলেজে একদল ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী একজন ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আরেকটি ফ্যাসিবাদের দিকে এগোচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে যাচ্ছে।
জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক গোলাম মর্তুজা, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় পাঠাগার সম্পাদক সোহেল রানা, ঠাকুরগাঁও জেলা এনসিপির আহ্বায়ক রকিবুল আলম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি সাঈদ আহমেদ সাইফী। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঠাকুরগাঁও জেলা আমীর বেলাল উদ্দিন প্রধান।

















