জয়সাগর নিউজ ডেস্ক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। হাতে সময় আছে আর মাত্র এক মাস ১১ দিন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে এখন বইছে নির্বাচনের তোড়জোড়। প্রার্থী বাছাই কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
এ অবস্থায় একদিকে প্রার্থীরা নিচ্ছেন নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও প্রশাসন একটি উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ৩০০ আসনে সংসদ সদস্য পদে লড়তে দুই হাজার ৫৮২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যা ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের ইঙ্গিত বহন করছে। তবে মাঠ পর্যায়ে কিছু গুজব ও সংশয়ের ডালপালা মেললেও সরকার ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় কিংবা অনিশ্চয়তা নেই।
তার পরও নির্বাচন নিয়ে জনমনে এখনো একটি প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে—সঠিক সময়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে তো? রাজনৈতিক মহলেও কিছুটা সংশয় রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সংশয়ের কোনো ভিত্তি নেই। প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব মুহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের ৮০ শতাংশের বেশি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। মানুষ ভোটের জন্য মুখিয়ে আছে। এখন আর নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ একেবারেই ভিত্তিহীন।’ সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তাঁরা সম্পূর্ণ ‘নির্বাচন মুডে’ কাজ করছেন। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা গুজব যাতে নির্বাচনের প্রস্তুতির পথে বাধা হতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট দূর করতে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতেও নজিরবিহীন পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে পোস্টিংয়ের যে সংস্কৃতি ছিল, সেটি ভাঙতে এবার প্রথমবারের মতো ‘লটারি’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি), ৫২৭ থানার ওসি এবং ১৬৬ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে বদলিপ্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। বর্তমান প্রশাসন দিয়েই আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম হব। এর পরও কারো কাজে গাফিলতি বা পক্ষপাতিত্ব পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ে তাদের সরিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ নির্বাচনের মাঠে
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের নেতিবাচক ইমেজ কাটিয়ে জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে পুলিশ সদর দপ্তর বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এবার পুলিশকে ‘মারণাস্ত্রের ব্যবহার’ কমিয়ে আনার বিশেষ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস, জলকামান বা নন-লেথাল ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে পুরোদমে নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন ঘিরে পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্বাচন নিয়ে কিছু নেতিবাচক কথা চালু থাকলেও বাস্তবে আমরা প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি রাখছি না।’
মাঠ পর্যায়েও প্রস্তুতির একই চিত্র। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে কনস্টেবল থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নির্বাচনসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করা।’
নির্বাচনকালীন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় শুধু পুলিশ নয়, একটি সমন্বিত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে একটি ‘মাল্টিলেয়ার সিকিউরিটি’ প্ল্যান তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম অঙ্গ সিভিল প্রশাসন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তাদের পদায়নে এবার ‘অরাজনৈতিক’ ও ‘নিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. খায়রুল আলম সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোট সুষ্ঠু করার জন্য আমরা প্রতিদিনই প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমাদের এখন মূল ধ্যান-জ্ঞান নির্বাচন। ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভোটকেন্দ্রের তালিকা যাচাই-বাছাই এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শেষ করা হয়েছে। ব্যালট পেপার পরিবহন এবং ভোটকেন্দ্রের সুরক্ষায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি মোকাবেলায় পুলিশের সাইবার ইউনিটকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। ডিবি ও এসবি কর্মকর্তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য অপরাধীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তা মুছতে হলে বর্তমান প্রশাসনকে শতভাগ নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। তবে লটারিতে পোস্টিং এবং পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের মতো উদ্যোগগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব সহ্য করা হবে না। কর্মকর্তাদের জন্য বার্তা স্পষ্ট, দেশ ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষাই তাঁদের প্রথম ও শেষ দায়িত্ব।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অঙ্গ এখন সক্রিয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া প্রার্থীদের সংখ্যা এবং মাঠ প্রশাসনের প্রস্তুতি এটা স্পষ্ট করে যে দেশ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে জোর কদমে এগিয়ে চলেছে। গুজব বা সংশয়ের কালো মেঘ কেটে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উৎসবের অপেক্ষায় এখন সারা দেশের মানুষ। সূত্র : কালেরকণ্ঠ



















