
* উচ্ছেদের নামে আইওয়াশ, অভিযোগ উঠলো তারিখ জালিয়াতিরও
* উচ্ছেদের চিঠি নিয়েও রহস্য: সওজের জমি দখল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে
স্টাফ রিপোর্টার, সিরাজগঞ্জ :
সিরাজগঞ্জে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সরকারি জমি দখল নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নতুন করে সামনে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য| উচ্ছেদের আশ্বাস ও প্রশাসনিক চিঠির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এখন ক্ষোভ বাড়ছে সর্বমহলে| অভিযোগ উঠেছে, উচ্ছেদের নামে লোক দেখানো চিঠি ইস্যু করেই দায়িত্ব শেষ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ; বাস্তবে দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না|
গত ৩ মে ২০২৬ তারিখে ˆদনিক জয়সাগর পত্রিকায় প্রকাশিত “সড়কের জমি লুটের মহোৎসব: রক্ষকই ভক্ষক, সিরাজগঞ্জে সওজের জমি দখলে দুর্নীতির নেটওয়ার্ক!” শীর্ষক প্রতিবেদনের পরপরই সিরাজগঞ্জ সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উচ্ছেদ কার্যক্রমের জন্য একটি চিঠি ইস্যু করেন| কিন্তু সেই চিঠির তারিখ নিয়েই দেখা দিয়েছে রহস্য ও প্রশ্ন|
চিঠিতে নির্বাহী প্রকৌশলীর – স্বাক্ষরের নিচে উল্লেখিত তারিখটি অস্পষ্ট| সেখানে “৫” সংখ্যাটি স্পষ্ট হলেও মাসের অঙ্কটি পরিষ্কার নয়| এটি ৫/৩/২০২৬ নাকি ৫/৫/২০২৬—তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি| অথচ একই চিঠির অনুলিপি গ্রহণের অংশে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ও উল্লাপাড়া মডেল থানার সিল এবং স্বক্ষরে স্পষ্টভাবে ৪/৫/২০২৬ তারিখ উল্লেখ রয়েছে| ফলে প্রশ্ন উঠেছে—চিঠিটি প্রকৃতপক্ষে কবে ইস্যু করা হয়েছে? আর তারিখের এই অস্পষ্টতা কি কোনো প্রশাসনিক গাফিলতি, নাকি ইচ্ছাকৃত কৌশল?
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সওজ বিভাগের একটি অসাধু চক্র বছরের পর বছর একই কৌশল অনুসরণ করে আসছে| সরকারি জমি দখলের অভিযোগ উঠলেই কিংবা সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই দায় এড়াতে উচ্ছেদের চিঠি ইস্যু করা হয়| এরপর শুরু হয় নানা অজুহাত, টালবাহানা ও প্রশাসনিক জটিলতার গল্প| শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম আর বাস্তবায়নের মুখ দেখে না|

অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়েই একশ্রেণির প্রভাবশালী দখলদার সরকারি জমিতে অবৈধভাবে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে যাচ্ছে| বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছেন| ফলে সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি অংশই এখন দখল বাণিজ্যের নেপথ্য কারিগরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে|
এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে, উল্লাপাড়া উপজেলার পৌর এলাকার বগুড়া-পাবনা মহাসড়ক সংলগ্ন কাওয়াক মোড় থেকে সরকারি আকবর আলী কলেজমুখী সড়কের পাশে একের পর এক অবৈধ পাকা স্থাপনা গড়ে উঠেছে| অভিযোগ রয়েছে, মোঃ নুর হোসেন, মোহাম্মদ আসাদ আলী ও মোঃ আব্দুল আলিমসহ কয়েকজন ব্যক্তি সরকারি জমি দখল করে টয়লেট, বসতঘর ও গোডাউন নির্মাণ করেছেন| এলাকাবাসীর দাবি, এসব দখলদারদের পেছনে রয়েছে সওজ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়|
উল্লাপাড়া সওজ উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ রিঠু মিয়া এর আগে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, উচ্ছেদের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন| অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী দায় চাপিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর| আর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী লিটন আহমেদ জানিয়েছিলেন, তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন এবং দ্রুত উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেবেন| তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়নি|
সচেতন মহলের মতে, এটি শুধু জমি দখলের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া| সড়কের জমি দখল হওয়ায় একদিকে জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে| তারা বলছেন,
দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে সরকারি জমি উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়বে|
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—উচ্ছেদের নামে এই নাটক আর কতদিন চলবে? প্রশাসনের নীরবতার আড়ালে কারা লাভবান হচ্ছে? আর কত টাকা হাতবদল হলে নড়েচড়ে বসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?
সরকারি জমি উদ্ধারে দ্রুত কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুরো বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা| অন্যথায় এই দখল সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা|


















